OrdinaryITPostAd

ডেঙ্গু রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার

ডেঙ্গু ভাইরাস বর্তমানে দেশের জন্য আতঙ্কের রোগ। ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বর ভয়াবহভাবে ছড়াচ্ছে। কারণ হচ্ছে, ডেঙ্গু সংক্রমণে অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষণ অপ্রকাশিত থাকে এবং এমনকি লক্ষণ থাকলেও অনেক চিকিৎসকই ডেঙ্গুর শনাক্তকরণে কোনো টেস্ট করানোর জন্য আগ্রহী নন।পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রথমবার এবং দ্বিতীয়বার সক্রমণে কোনো গবেষণাপত্র তেমনভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না।

কারণ, ডেঙ্গু ভাইরাসের জন্য আলাদা কোনো ওষুধ নেই, চিকিৎসা শুধু উপসর্গগুলো নিয়ন্ত্রণ করা। তাই, প্রথম ডেঙ্গু সংক্রমণ অনেক ক্ষেত্রেই নির্ণয় হয় না, সেহেতু এবার যেসব রোগীগণ ডেঙ্গু শক সিনড্রোম এ আক্রান্ত হয়েছেন অথবা মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের পূর্ববর্তী ডেঙ্গু সংক্রমণের আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। IEDCR এর তথ্যমতে, বাংলাদেশে ডেনভি-১, ডেনভি-২ এবং ডেনভি-৩ এর অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া গেছে। IEDCR এর তথ্যমতে- ২০১৯ সালে ডেনভি-৩ দিয়ে সক্রমণের হার বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। 

পূর্ববর্তী গবেষণায় দেখা যায় যে ডেনভি-৩ দিয়ে সংক্রমণে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার এবং ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হার অন্যান্য দেশে ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি। আবার এমনও হতে পারে, বাংলাদেশে ডেঙ্গু ভাইরাসগুলোর মিউটেশনের ফলে নতুন প্রকারের একটি ডেঙ্গু ভাইরাস তৈরি হয়েছে, সে জন্যে ডেঙ্গু রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার নিয়ে জটিলটা হচ্ছে। এ জন্য দরকার ভবিষ্যত গবেষণা। তবে আমি মনে করি যে, প্রত্যেক রোগীদের প্রথমবার ডেঙ্গু জ্বরের আশঙ্কা হলে ডেঙ্গু ভাইরাস শনাক্তকরণ জরুরি এবং ডেঙ্গু রোগের লক্ষণ সাদৃশ্যে ওষুধ প্রয়োগ করলে দ্রুত আরোগ্য সম্ভব।

পোস্ট সূচিপত্র

ডেঙ্গু জ্বরের কারণ

ডেঙ্গু জ্বর একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এটি ডেঙ্গু ভাইরাসবাহী এডিস নামক মশার কামড়ে হয়। এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে ৫ ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসারের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, সেগুলো হলো- ডেনভি-১, ডেনভি-২, ডেনভি-৩, ডেনভি-৪ এবং ডেনভি-৫ (২০১৩, ইন্ডিয়া)। ডেঙ্গু জ্বর ৩ প্রকারের: ১) ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বর ২ ) ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার, ৩) ডেঙ্গু শক সিনড্রোম এবং ৪) এক্সপ্যানডেড ডেঙ্গু সিনড্রোম। মানুষের শরীরে যদি প্রথমবার এই ৫ ডেঙ্গু ভাইরাসের যে কোনো একটি দিয়ে সংক্রমিত হয়, তাহলে লক্ষণসমূহ প্রকাশিত অথবা অপ্রকাশিত হতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রথমবার ডেঙ্গু সংক্রমণ হলে ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বরের হয়। 

এটি কোনো ধরনের জটিলতা ছাড়াই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্বারা নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ওই নির্দিষ্ট প্রকারের ডেঙ্গু ভাইরাস বিপরীতে রোগ প্রতিরোধকারী এন্টিদেহ তৈরি হয় যা ভবিষ্যতে ওই নির্দিষ্ট প্রকারের ডেঙ্গু সংক্রমণকে প্রতিহত করে। আশঙ্কার কথা এই যে, দ্বিতীয়বার ওই ব্যক্তি যদি বাকি ৪ প্রকারের ডেঙ্গু ভাইরাসের যে কোনো একটিতে সংক্রমিত হয়, তাহলে তা মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে যা ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার, ডেঙ্গু শক সিনড্রোম এবং এক্সপ্যানডেড ডেঙ্গু সিনড্রোম নামে চিকিৎসকগণের কাছে পরিচিত। এতে ডেঙ্গু রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চিকিৎসা গ্রহণ না করলে ওই ব্যক্তির মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। 

আরো পড়ুন: প্রাকৃতিক উপায়ে মুখের কালো দাগ দূর করার উপায়

সাধারণ ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণসমূহঃ

  1. ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বর (১০০-১০৪ ডিগ্রি ফাঃ)
  2. চোখের পেছনে ব্যথা
  3. মাথাব্যথা
  4. মাংসপেশিতে ব্যথা
  5. অস্থি ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা (হাড়ভাঙ্গা ব্যথা-বেকবোন ফিল্ডার)
  6. খাবারে অরুচি
  7. বমি বমি ভাব এবং বমি
  8. র‌্যাশ দেখা দেওয়া (মুখমন্ডল, গলা এবং বুকের চামড়ায় লালচে বর্ণ বা দানা)

ডেঙ্গু জ্বরের সতর্কতামূলক লক্ষণসমূহঃ

  1. ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার
  2. ডেঙ্গুশক সিনড্রোম এবং এক্সপ্যানডেড ডেঙ্গুসিনড্রোম
  3. চামড়ায় ছোট, মাঝারি অথবা বড় আকারের লালচে দানা
  4. দাঁতের মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া
  5. নাক দিয়ে রক্তপড়া
  6. চোখের কোণে রক্তজমা
  7. পেটে প্রচণ্ড ব্যথা এবং কালো পায়খানা
  8. অনবরত বমি এবং রক্তবমি
  9. মেয়েদের মাসিকের সাথে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ
  10. অতিরিক্ত দুর্বলতা, খিটখিটে স্বভাব এবং অস্থিরতা
  11. রক্তের চাপ কমে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট হওয়া
  12. তন্দ্রাচ্ছন, বিভ্রান্ত ও অজ্ঞান হওয়া
  13. পেটের ডান দিকে উপরিভাগে ব্যথা এবং চাকা অনুভব (লিভার বড় হলে)
  14. শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়া (৯৬ ডিগ্রি ফাঃ এর চেয়ে কম)
  15. চোখ কোঠরে যাওয়া, মুখমন্ডল, জিহ্বা এবং ঠোঁট শুকিয়ে যাওয়া
  16. ৬ ঘণ্টার মধ্যে প্রস্রাব না হওয়া

পরীক্ষা-নিরীক্ষাঃ

CBC, R/E M/E, ASO Titre, Widal Test, RA / Rf test, Triple Antigen, CRP, TPHA,

ICT for Malaria, ICT for Dengue Virous প্রয়োজনে আরো পরীক্ষা করা যেতে পারে।

ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসাঃ

সাধারণ বা ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গুর কোনো ধরনের চিকিৎসা ছাড়াই ৭দিনের মধ্যে সাধারণত ভালো হয়ে যায়। তবে ২০১৯ সালের ডেঙ্গুর ভাইরাসের সংক্রমণের ফলে ডেঙ্গুশক সিনড্রোম এবং এক্সপ্যানডেড ডেঙ্গুসিনড্রোম দেখা যাচ্ছে এবং এর কারণে অনেক প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে। দু'একদিনের জ্বরে শরীরের রক্তচাপ কমে গিয়ে রোগী শকে চলে যাচ্ছেন। জ্বরে শরীরের তাপমাত্রাও থাকছে কম ১০০-১০২ ডিগ্রি ফাঃ। এসব জটিলতা এড়াতেই অপেক্ষা না করে জ্বরের প্রথম দিনে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি। এ ছাড়াও চিকিৎসকগণ কিছু রোগীকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন যাদের ডেঙ্গু রোগের লক্ষণ দেখা দিলেই প্রথম দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে হবে।

আরো পড়ুন: প্রাকৃতিক উপায়ে মাসিক হওয়ার উপায়

ঝুঁকিপূর্ণ  ক্ষেত্রসমূহঃ

  1. এক বছরের কম বয়সী বাচ্চা
  2. গর্ভবর্তী মা
  3. বৃদ্ধ ব্যক্তি
  4. ডায়াবেটিক
  5. হার্টের সমস্যা
  6. উচ্চরক্তচাপ
  7. কিডনির সমস্যা
  8. লিভারের সমস্যা

ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রতিষেধকঃ

২০১৯ সালের পর থেকে  ডেঙ্গু পরিস্থিতি আবার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ডেঙ্গুজ্বর এখন আর শুধু  রাজধানী ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন জেলায় তা ছড়িয়ে পড়েছে। এ রোগের প্রাদুর্ভাব এখন প্রতি বছরই দেখা দিচ্ছে এবং প্রতি ক্ষেত্রেই মারাত্মক আকার ধারণ করছে। প্রতিরোধক ব্যবস্থা হিসেবে  প্রাথমিকভাবে স্প্রে দিয়ে মশা নিধন তেমন কোনো কাজে আসছে না। অধিকন্তু এডিস মশা তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে অনেক প্রতিরোধী পরিবর্তন আনছে এবং দিন বা রাত যেকোনো সময় কামড়াচ্ছে। সরকারের উচিত মশা নিধনের সর্বাধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা। এর মধ্যে জেনেটিক পদ্ধতিতে মশা বন্ধ্যাত্বকরণ পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে পারে।

তবে আশার কথা এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হচ্ছে ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করা। ডেঙ্গুজ্বরের নেই কোনো নির্দিষ্ট  চিকিৎসা, কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধও নেই। একমাত্র ভ্যাকসিনই ডেঙ্গু প্রতিরোধের কার্যকরী ব্যবস্থা।  জাপানের টাকেডা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি সম্প্রতি ডেঙ্গুর নতুন জেনারেশনের ভ্যাকসিন কিউডেঙ্গা (টিএকে-০০৩) তৈরি করেছে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে  যা অত্যন্ত কার্যকরী ও নিরাপদ। সম্প্রতি কিউডেঙ্গা ভ্যাকসিন  ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডে জনসাধারণের ওপর প্রয়োগের অনুমোদন পেয়েছে।

বর্তমানে হোমিও চিকিৎসায়ও যাচ্ছে ভাল ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে। যদিও হোমিও চিকিৎসায় প্রতিষেধক ওষুধ হয় না, তারপরও সম্ভাব্য প্রয়োগ করে দেখতে  পারেন, যেমন- এসিড কার্বলিক/ লিডাম পাল IM, 10M, 50M, CM শক্তি ২০নং গ্লবিউসে তৈরি করে ভোর, দুপুর ও রাতে তিনটি করে বড়ি দুই দিন সেবনের পর থেকে ওষুধের ক্রিয়াকাল শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ ডোজ ওষুধ বয়স অনুযায়ী প্রয়োগ করলে ডেঙ্গু ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভাবনা থাকতে পারে। 

ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রতিরোধে করণীয়

ডেঙ্গু ভাইরাস প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হচ্ছে এডিস মশার বংশ বৃদ্ধি রোধ এবং এর কামড় থেকে রক্ষা পাওয়া। কিছু বিষয় সম্পর্কে সচেতন হলে এডিস মশাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। দরকার সরকারের পাশাপাশি প্রত্যেকের স্বতন্ত্র উদ্যোগ। নিম্নলিখিত উপায়ে ডেঙ্গুভাইরাস সংক্রমণ থেকে বাঁচা সম্ভব।

ঘরের ভেতরে এবং বাইরে জমে থাকা পানি তিন দিনের মধ্যে অপসারণ, যেমন ফুলের টব, ফুলদানি, একুরিয়াম, আর্টিফিশিয়াল ঝর্ণা, ডাবের খোসা, টায়ার এমনকি বাথরুমের ভেজা ফ্লোর, বেসিন এবং কমোড। ঘরের দরজা-জানালায় নেট ব্যবহার, দিনের বেলায় মশারি টাঙ্গিয়ে ঘুমানো, লম্বা জামা এবং প্যান্ট পরিধান, মশার রিপিল্যান্ট ব্যবহার, আক্রান্ত রোগী কে মশারির মধ্যে রাখা এবং অসুস্থ অবস্থায় অন্য এলাকায় ভ্রমণ থেকে বিরত থাকা উচিত। সার্বক্ষণিক দেশের সরকারের নির্দেশিকা অনুযায়ী জীবনকে পরিচালনা করা উচিত ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ১

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ২

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ৩

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ৪